চট্টগ্রামের পাঠকপ্রিয় অনলাইন

ম্যাক্স হাসপাতালের নামে অভিযোগের পাহাড়

সিটিজি বাংলাঃ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কোনো প্রকার লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতাল। কাগজে-কলমে ৮০ শয্যা থাকার কথা থাকলেও তারা ব্যবসা পরিচালনা করছে ১৫০ শয্যা দিয়ে। এতে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে তারা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে তারা হাসপাতাল ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাছাড়া আবাসিক এলাকা ও সড়কের ওপর হাসপাতাল নির্মাণ না করার নির্দেশনা থাকলেও তা মানেনি ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ ও লিফটও বসিয়েছে হাসপাতালটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বেশ কয়েকজন এখানে চিকিৎসা নিতে এসে চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে চলে গেছেন না-ফেরার দেশেও। এমন নানা অভিযোগের পাহাড় রয়েছে বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালের বিরুদ্ধে।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন করে ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৮০ শয্যার অনুমোদন নিয়ে ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করে হাসপাতালটি। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ম্যাক্সের অভিনব জালিয়াতির চিত্র। ৮০ শয্যার অনুমোদন হলেও ১৫০ শয্যার হাসপাতালই ব্যবহার করছে ম্যাক্স। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির ১০ তলায় জেনারেল ২৫ শয্যা, চার তলায় ২০ শয্যার আইসিইউ, ছয় তলায় ২৫ শয্যার সিসিইউ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম তলায় ১৪ শয্যা করে ৪২ শয্যা জেনারেল কেবিনসহ মোট ১৫০ শয্যা রয়েছে। হাসপাতালটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও ১৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাচিপ নেতা ও বিএমএর সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল ইকবালের মদদেই ম্যাক্স হাসপাতাল এমন অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলেই নিজের বলয় নিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। সর্বশেষ এই হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মারা যায় সমকাল চট্টগ্রাম ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার রুবেল খানের একমাত্র শিশুকন্যা রাইফা খান।

READ  সিইসি আবারও বললেন জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা

ম্যাক্স হাসপাতালে রাইফার মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে এসে লাইসেন্স ত্রুটিপূর্ণ থাকার প্রমাণ পেয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যাক্স হাসপাতাল সরেজমিন পরিদর্শন করে ও সংশ্নিষ্ট তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে হাসপাতালটির লাইসেন্সে ত্রুটি পাওয়া গেছে। তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসির কোনো অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতাল চালাচ্ছে। কেবল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে ম্যাক্স। যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করে হাসপাতালটি বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ ম্যাক্স হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের অধিকাংশই অষ্টম কিংবা এসএসসি পাসের প্রমাণ পাওয়ার বিষয়টিও তিনি সাংবাদিকদের জানান। কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘শিশুমৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। এ ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ম্যাক্স হাসপাতালের অনুমোদনপ্রাপ্ত শয্যাসংখ্যা ৮০। তারা সর্বোচ্চ ৮০ শয্যাই ব্যবহার করতে পারবে। যদি এর চেয়ে বেশি করে, তাহলে তা অবৈধ বলেই বিবেচিত হবে। যদি এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ম্যাক্স হাসপাতালের ম্যানেজার অশিদ দে সমকালকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালের ১৫০ শয্যার অনুমোদন আছে। শয্যা অনুযায়ীই আমরা ট্যাক্স প্রদান করি। এখানে নিয়ম ও নকশা অনুযায়ীই ভবন এবং লিফট নির্মাণ করা হয়েছে। হাসপাতালের গ্রাউন্ড ফ্লোরে পার্কিংও রাখা হয়েছে।’

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে তিনি কোনো কিছুই জানেন না বলে অপারগতা প্রকাশ করেন সমকালের কাছে। হাসপাতালের নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে কথা বলতে ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. লিয়াকত আলী খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসকদের অবহেলায় মেয়ে হারালেন প্রদীপ সরকার

দিনটি ছিল চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল। জ্বর, পায়খানা ও বমি নিয়ে ম্যাক্স হাসপাতালে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মেয়ে নবনি সরকার মৌনতাকে ভর্তি করান বাবা প্রদীপ সরকার। তিনি জানান, ভর্তির দিন রাতে ম্যালেরিয়া হয়েছে বলে একটি ইনজেকশন পুশ করা হয় মেয়ের শরীরে। পরে ভোরে তার শ্বাস-প্রশ্বাস অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় তাকে। বিষয়টি হাসপাতালের এক ডাক্তারকে জানানো হলেও তিনি পরের দিন সকাল ৯টায় আসবেন বলে আসেন রাত ৯টায়। ততক্ষণে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে তার। মেয়ের ডেঙ্গু হলেও ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দেন ম্যালেরিয়ার। যে কারণে তার শারীরিক অবস্থা ভালো হওয়ার চেয়ে উল্টো খারাপ হয়ে যায়। ভর্তির দু’দিন পর চিকিৎসকরা হঠাৎ মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন। সেখানে ভর্তি করার পর চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গুর পাশাপাশি তার লিভার ও লাঞ্চের সমস্যা হয়েছে। সঠিক সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুর চিকিৎসা না পাওয়ায় টানা এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ৭ মে মেয়ের মৃত্যু হয়।’

READ  জলাবদ্ধ বন্দর নগরী উদ্ধারে ত্রিমুখী লড়াই

প্রদীপ সরকার বলেন, ‘ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই আমার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে।’

ম্যাক্সে অনুমতি ছাড়াই নকশাবহির্ভূত লিফট

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কোনোরূপ অনুমতি ছাড়াই নকশাবহির্ভূতভাবেই ক্যাপসুল লিফট বসানো হয়েছে ম্যাক্স হাসপাতাল। জানা গেছে, নতুন করে আরেকটি লিফট স্থাপনের জন্য সিডিএ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে ম্যাক্স হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ম্যাক্স কর্তৃপক্ষকে নতুন করে কোনো লিফট স্থাপনের অনুমতি দেয়নি সিডিএ। এ বিষয়ে সিডিএ অথরাইজড অফিসার-২ মো. শামীম বলেন, ‘নকশাবহির্ভূতভাবে লিফট সংযুক্ত করায় ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এর আগেও কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা আবারও কাজ শুরু করেছে শুনে আমরা ঘটনাস্থলে পরিদর্শক পাঠিয়ে কাজ বন্ধ রেখেছিলাম। তবে লিফটের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা অমান্য করে লিফট সংযুক্ত করেছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে তারা আইনবহির্ভূতভাবে হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। এ বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হাসপাতালের কারণে তীব্র যানজট

চট্টগ্রামের মেহেদীবাগ সড়কটি অত্যন্ত সরু। এই সড়কের ওপরই গড়ে তোলা হয়েছে বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতাল। হাসপাতালে রাখা হয়নি বড় কোনো পার্কিং স্পেসও। যে কারণে হাসপাতালে প্রবেশ করা গাড়িগুলো রাস্তার ওপরই রাখা হয়। এতে রাস্তার দুই পাশেই তৈরি হয় তীব্র যানজট।

মেহেদীবাগের কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিয়ম আছে কোনো আবাসিক এলাকা ও সড়কের ওপরে হাসপাতাল করা যাবে না। কাগজে-কলমে এমন থাকলেও তা অমান্য করে অভিজাত ম্যাক্স হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। এতে এ এলাকার বাসিন্দাসহ যাতায়াত করা সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত তীব্র যানজটের সম্মুখীন হতে হয়।’

প্রসঙ্গত, গত ২৮ জুন বিকেলে সামান্য জ্বর ও গলাব্যথা নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় আড়াই বছরের শিশু রাফিদা খান রাইফাকে। চিকিৎসকদের ভুলে ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় মৃত্যু হয় শিশু রাইফার।

READ  ক্যামেরা জার্নালিস্টদের ফ্যামিলী নাইটে যা বললেন আ জ ম নাছির

সূত্রঃ দৈনিক সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*