চট্টগ্রামের পাঠকপ্রিয় অনলাইন

চট্টগ্রাম-১৩ : শক্ত অবস্থানে আ.লীগ, কেন্দ্রের অপেক্ষায় বিএনপি

সিটিজি বাংলাঃ

ছবিতে বাম দিক থেকে প্রথম সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, ২য় সরওয়ার জামাল নিজাম, ৩য় বেগম ওয়াসিকা আয়েশা খাঁন, ৪র্থ মোস্তিাফিজুর রহমান।

চট্টগ্রাম-১৩ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ২৯০তম আসন। সীমানা আনোয়ারা-কর্ণফুলী দুটি উপজেলায় এক আসন। মোট ভোটার রয়েছে ৩ লক্ষ ৯ হাজার ৩৯৯ জন। আসনটি’র আনোয়ারা উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন এবং কর্ণফুলী উপজেলায় রয়েছে ৫টি ইউনিয়ন।

এর মধ্যে কর্ণফুলীতে ১ লাখ ১০ হাজার ৭৫৭ জন ও আনোয়ারায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪২ ভোটার। কর্ণফুলী উপজেলায় ভোটকেন্দ্র ৩৯ টি আর ভোটকক্ষ ২৫৫টি। এছাড়াও আনোয়ারায় ভোটকেন্দ্র ৬৭টি আর ভোটকক্ষ বেড়ে ৪০১টি।

সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীগণ মতবিনিময় সভা এবং দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আসনটিতে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র প্রার্থীর মধ্যে। আসনটিতে কে হচ্ছেন নৌকার মাঝি এবং কে পাচ্ছেন ধানের শীঁষ এ নিয়ে নির্বাচনী এলাকা সরগরম হয়ে উঠছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ:
বর্তমান ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের দুই উপজেলার সক্রিয় নেতারা রয়েছেন। অপরদিকে আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ওয়াশিকা আয়েশা খাঁন এমপি। তবে দুজনেই প্রয়াত পিতার উত্তরসূরী, পরিচিতি ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি হিসেবে জনসর্মথনে এগিয়ে রয়েছেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি):
বিএনপি যদি ২০০১ সালের মতো হারানো দুর্গ ফিরে পেতে চায় তাহলে এ আসনে যোগ্য প্রার্থী দিতে হবে। কারণ আ.লীগের সম্ভাব্য জাবেদ একজন হেভিওয়েট প্রার্থী। তার সঙ্গে দুর্বল প্রার্থী দিয়ে ভোটযুদ্ধ জমে উঠবে না। পাশাপাশি দলের মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে।

আনোয়ারা-কর্ণফুলী সংসদীয় আসনের বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও বিএনপি নেতা মোস্তাফিজুর রহমান সহ অনেকে। দ্বি-ধারায় বিভক্ত আনোয়ারা-কর্ণফুলী বিএনপিতে চলছে হিসাব নিকাশ। বিগত কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দূরে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে সরওয়ার জামাল নিজামের বিরুদ্ধে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলীয় নেতাদের কোন খবর রাখেনি বলেও অভিযোগ দলের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের।

READ  কর্ণফুলীতে নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরীর সাথে স্থানীয়আ'লীগের মতবিনিময়

কারা নির্যাতিত নেতা দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আলী আব্বাস তৃণমূলে অনেকদিন কাজ করে গেছেন অতীতে। দলের দুঃসময়েও পাশে ছিলেন। জেল হতে বের হয়ে নেতাকর্মীদের প্রায় খোঁজ খবর নিচ্ছেন।

অপরদিকে নতুন মুখ হিসেবে আনোয়ারা-কর্ণফুলী বিএনপির সাথে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অনুসারিরা রাজনীতির মাঠে একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এ অংশকে সাথে নিয়ে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপি নেতা ব্যবসায়ি মোস্তাফিজুর রহমান।

এ লক্ষে তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপি ও দলের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাদের একতাবদ্ধ করতে চেষ্টা করছেন তিনি। নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন আনোয়ারা-কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন সামাজিক ও দলীয় কর্মকা-ে। বিএনপির একটি অংশ তাকে সমর্থন দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি একটি নিবাচনমুখী দল। আগামী নির্বাচনে বিএনপি দলের ত্যাগী ও তরুণদের মনোনয়ন দিবেন। তাই আশা করি, আমি মনোনয়ন পাবো এবং বিএনপির হারানো আসন পুনরুদ্ধার করে ম্যাডামকে পুনরায় উপহার দিতে পারবো। ’

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে কর্ণফুলী উপজেলার বিএনপির এক সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে এ আসনের জন্য একজন তরুণ নেতার প্রয়োজন। এতে মোস্তাফিজের বিকল্প চোখে পড়ে না। কেনোনা দলের কঠিন সময়ে তিনি প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে তিনি অবদান রেখে চলছেন।’

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সরওয়ার জামাল নিজাম পুনরায় দলীয় মনোনয়ন পেতে ঢাকায় জোর লবিং করছেন। অন্যদিকে কবীর চৌধুরীর অনুসারীদের মধ্যে মনোনয়ন পেতে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানও থেমে নেই। তা ছাড়া, তৃণমুলের একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা পরিবর্তন চায় চট্টগ্রাম ১৩ আসনে। কেনোনা র্দীঘ ১০ বছরে মাঠে নেই সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজাম। মাঠে লক্ষ্যনীয় ছিলো চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি সভাপতি সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও আনোয়ারার মোস্তাফিজ রহমান এর সঙ্গে।

READ  ব্লগার হত্যায় জড়িত সন্দেহে সীতাকুণ্ডের জামায়াত নেতার ভাই আটক

যদিও এই আসনে বিএনপি থেকে কে প্রার্থী হচ্ছেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। নেতা-কর্মীদের বড় অংশ গত কয়েক বছরের মামলা, হামলায় কোণঠাসা। এলাকা ছাড়া অনেকেই। এখন পর্যন্ত বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের কারও মাঠে তৎপরতা নেই। দুই উপজেলায় বিএনপির বড় নেতা হলেন সাবেক সংসদ সরোওয়ার জামাল নিজাম ও দক্ষিণ জেলার সিনিয়র যুগ্ন সম্পাদক আলহাজ্ব আলী আব্বাস। বিএনপি নেতা এম মঈন উদ্দিন বলেন, স্থানীয় নেতা-কর্মীরা এ আসনে নতুন কাউকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে আগ্রহী।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি তাদের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। মামলা-হামলায় কাবু বিএনপি-জামায়াতের কর্মকা- অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। তবে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নীরবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে স্থানীয় কয়েকজন নেতা বলেছেন, গত ওয়ান-ইলেভেনের অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে তরুণদের প্রাধান্য দেয়া হতে পারে। দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করায় অনেকেই মনোনয়ন তালিকা থেকে ছিটকে পড়তে পারেন।

তরুণ নেতাদের মধ্যে মনোনয়ন তালিকায় এগিয়ে আছেন সরকার বিরোধী আন্দোলনের দুঃসময়ে দলের দায়িত্ব পালন করা ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান। আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে এলাকায় তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ‘জাতীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি কিছু বলতে পারব না।’

জাতীয় পার্টি: ২০১৪ সালেও এ আসনে জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন । তবে সুবিধা করতে পারেনি। এবারো এ আসনে আলোচনায় আছেন বহিস্কৃত চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির সিনিয়র সহ সভাপতি তপন চক্রবর্তী। এছাড়াও আনোয়ারা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আবদুর রব চৌধুরী টিপুর নাম ও শোনা যায়।

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট: বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব এম এ মতিনের নেতৃত্বে আনোয়ারা-কর্ণফুলী দুই উপজেলায় নেতাকর্মীদের নিয়ে সমাবেশ করতে দেখা যায়। এ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী এম এ মতিন। অনেকটা তৎপর আসন ভাগিয়ে নিতে জোট হতে।

ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ: ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে বেশ সক্রিয় রয়েছেন । এ আসন থেকে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী রিজভী মনোনয়ন চাইতে পারেন।

READ  সীতাকুণ্ডে আনসারের গুলিতে কিশোর নিহত, সড়ক অবরোধ

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, বিগত নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী আসনটিতে সরওয়ার জামাল নিজাম ১৯৯৬ সালে প্রায় ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতাউর রহমান খান কায়সারকে হারান। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকেও। তবে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তাঁকে প্রায় ২৩ হাজার ভোটে হারিয়ে জয়ী হন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।

১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ ইদ্রিছ বিকম। ১৯৭৯ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। ১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।

১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে সাংসদ হন জাসদ প্রার্থী মোখতার আহমেদ। ১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম। ১২ জুন সপ্তম সংসদ ও ২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম।

পরবর্তী ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু সর্বশেষ সংসদ নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে তাঁর মৃত্যুতে ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি উপ নির্বাচনে মনোনয়ন পান তারই জ্যেষ্ঠ পুত্র ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।

নির্বাচনে জাবেদ বিজয়ী হওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন নতুন প্রজন্মের এই নেতা। এরপর ৫ জানুয়ারির বিএনপি বিহীন নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাবেদ। পরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেলে আনোয়ারা-কর্ণফুলীবাসী প্রথমবারের মতো মন্ত্রীর স্বাদ পায়।

বর্তমানে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে এবং বিএনপি’র বিভক্ত নেতারা এখনো কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কে পাচ্ছেন মনোনয়ন সে দৃষ্টিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*