চট্টগ্রামের পাঠকপ্রিয় অনলাইন

ফিচার

চট্টগ্রামের পটিয়ার রবিন যেভাবে জনপ্রিয় কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চু

সিটিজি বাংলা, রুমেন চৌধুরী

আইয়ুব বাচ্চু ও তার পরিবার

বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ১৭ নম্বর খরনা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। মোহাম্মদ ইসহাক ও মৃত নুরজাহান বেগম দম্পতির সন্তান তিনি। তারা তিন ভাই। নেই কোন বোন। মা মারা গেলেও আইয়ুব বাচ্চুর বাবা এখনও জীবিত রয়েছেন। আইয়ুব বাচ্চুর পিতার চাচাতো ভাই আবদুল আজিজ বসবাস করেন পটিয়ার সেই পৈতৃক বাড়িটিতে।

 

আইয়ুব বাচ্চুর দাদা মরহুম হাজী নুরুজ্জমা সওদাগর। মোজাফফরাবাদ এন.জে উচ্চ বিদ্যালয়, কৃষি অফিস, তহসিল অফিস, খরনা বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা, খরনা রেল স্টেশনসহ ১১টি প্রতিষ্ঠানের জমি দাতা হচ্ছেন তিনি।

 

প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর দাদা হাজী নুরুজ্জমা সওদাগরের নামে স্বপ্নের একটি হাসপাতাল শীঘ্রই প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছে ছিল গুণী এই শিল্পীর। কিন্তু অকাল মৃত্যুর কাছে হার মেনে থেমে গেল সেই স্বপ্ন। ব্যস্ততার কারণে গ্রামের বাড়িতে না আসলেও আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ রাখতেন তিনি।

১৯৭২ সালে কিছু গান পাগল তরুণের হাত ধরে যখন দেশের প্রথম ব্যান্ডদল সোলসের যাত্রা শুরু তখনো হাতেখড়ি হয়নি ছোট্ট রবিন তথা আজকের আইয়ুব বাচ্চুর। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রামের মুসলিম বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় পরিক্ষায় ভালো ফল করায় ছেলে আইয়ুব বাচ্চুর হাতে তার বাবা একটি কালো গিটার কিনে দেন। সেই শুরু…

 

প্রথম দিকে চট্টগ্রাম নগরীর জুবলী রোড এলাকা ছিল গান পাগল কিছু তরুণের ডেরা। তাদেরইও একজন ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। পরিবারের তেমন কেউ গানের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার ঝোঁক। বাবার দেয়া কালো রঙের সেই অ্যাকুয়েস্টিক গিটারেই প্রথম তার আঙুলের টুংটাং ছোঁয়া পড়ে। ওই সময় একদিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গিটারবাদক জিমি হ্যানড্রিকস, রিচি ব্রাকমোর, কার্লোস স্যানটানা, অন্যদিকে দেশের পপশিল্পী আজম খানের গিটারবাদক নয়ন মুন্সীর গিটারে পারদর্শিতা আইয়ুব বাচ্চুকে মুগ্ধ করে।

 

তিনি সিদ্ধান্ত নেন ওদের মতো তাকেও গিটারে পারদর্শী হতে হবে। তবে সময়টা তখন বৈরী ছিল। সরাসরি কারও শিষ্যত্ব না পেলেও চট্টগ্রামের রউফ চৌধুরী, বন্ধু নওশাদ ও সাজুর সহায়তায় তিনি গিটার বাজাতে শুরু করেন। গিটার বাজিয়ে জীবনের তার প্রথম উপার্জন ছিল ৩০ টাকা।

প্রয়াত কিংবদন্তী শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু

 

কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে একটা ব্যান্ডদল গঠন করেন। প্রথমে ব্যান্ডের নাম রাখা হয় ‘গোল্ডেন বয়েজ’, পরে নাম পাল্টিয়ে রাখা হয় ‘আগলি বয়েজ’। বিয়েবাড়ি, জন্মদিন আর ছোটখাট নানা অনুষ্ঠানে এ ব্যান্ডদল নিয়ে গান করতেন আইয়ুব বাচ্চু। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুরা যে যার মতো ছুটে গেলেও গানের পেছনে লেগে থাকেন আইয়ুব বাচ্চু। এর মধ্যে ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের হয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে গান শুরু করেন তিনি।

 

সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘চট্টগ্রামের অলিগলিতে রাতের পর রাত আমি গিটার হাতে বেড়িয়েছি। কাঁধে গিটার নিয়ে বিয়ে বাড়িতে হাজির হয়েছি। গিটার বাজিয়েছি। চট্টগ্রাম আমার নাড়ি পোঁতা শহর। এ শহরে আমার মা ঘুমিয়ে আছেন। এ শহরেই আমি আবারও ফিরে আসব।’

 

৩৪৪ জুবিলী রোড, নুরুজ্জামান সওদাগরের বাড়ি। চট্টগ্রাম নগরের এনায়েত বাজার এলাকার তিনতলার ভবনটির গায়ে শেওলা জমেছে। বিভিন্ন জায়গায় জন্মেছে পরগাছা। দীর্ঘদিন রং না করায় এখন বিবর্ণ। হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে ভবনটিতে দর্শনার্থীর আনাগোনা বেড়ে গেছে। একের পর এক আসতে থাকে সাংবাদিকের গাড়ি।
এই বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ফিরিঙ্গিবাজারের হাজী নুরুজ্জামান আবাসিক এলাকার ‘হাজী বিল্ডিং’ ও ‘সখিনা ম্যানশন’। সেখানেও একই চিত্র। চট্টগ্রাম নগরের তিন ভবনে এখন শোকের ছায়া। কারণ এই ভবনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর বেড়ে ওঠার স্মৃতি। এসব ভবনের বাসিন্দারা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁদের প্রিয় ‘বাচ্চু’ আর নেই।
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে শুধু গানের জগতে কিংবা গায়কের শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি। গিটারিস্টদের জগতে বিশাল একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ছিলেন এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্টদের একজন।

 

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এ কথা জানান দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ নেওয়াজ। তাঁর হাত ধরেই সোলসে এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সময় তখন ১৯৮২ সাল।

সেদিনের কথা স্মৃতিচারণা করে আহমেদ নেওয়াজ বলেন, ১৯৭৩-৭৪ সালে সোলসের যাত্রা শুরু হয়। শুরুর দিকে ভালোই চলছিল। কিন্তু ১৯৮২ সালের দিকে সংকটে পড়ে সোলস। এই সংকট ছিল গিটারিস্টের। ওই সময়ে শুনতে পান আইয়ুব বাচ্চুর কথা। নগরের দেওয়ানহাট এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় কথা হলে তাঁকে সোলসে যোগ দিতে বলা হয়। এরপর গিটারিস্ট হিসেবে সোলসে যোগ দেন তিনি। বাচ্চু যোগ দেওয়ার পর সোলসের গানের ধরন পাল্টে যায় বলে মন্তব্য করেন আহমেদ নেওয়াজ।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিকেলে সবাই দুই-তিন ঘণ্টা প্র্যাকটিস (অনুশীলন) করতাম। কিন্তু বাচ্চু রাত দুই-তিনটা পর্যন্ত প্র্যাকটিস করতেন।’

 

আইয়ুব বাচ্চু যখন গানের পেছনে ছুটছেন, ততদিনে মোটামুটি চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল ‘সোলস’। ১৯৭৮ সালের শেষ দিকেই সোলস-এ যোগ দেন বাংলা ব্যান্ডের ‘ক্ষ্যাপা’ তরুণ হিসেবে পরিচিতি পেতে যাওয়া আইয়ুব বাচ্চু। শুরু হলো বাংলার সর্বকালের সেরা একটি ব্যান্ড দলের যাত্রা- যেখান থেকে বাংলা আধুনিক ও ব্যান্ড সঙ্গীতের আকাশে স্বমহিমায় ঠাঁই করে নিয়েছে একটি নক্ষত্র হিসেবে। সেই তরুণ তুর্কি আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে ব্যান্ডের গিটারিস্ট, ভোকাল, গীতিকার ও সুরকার।

 

কতটা গান পাগল মানুষ ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু তার প্রমাণ মেলে একটি ঘটনায়, এল আর বি’র ফেসবুক পেজে সেই ঘটনার বর্ণনা দেয়া আছে এভাবে, ‘১৯৯১ সালের এক ফাগুনের দিনে ‘সোলস’ এর গিটারিস্ট সুহাসের চট্টগ্রাম হিল বর্তমান ফরেস্ট কলোনির এলাকার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সবাই। সঙ্গে ছিলেন গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গি। সেখানে যাওয়ার পর সবাই মিলে আশপাশের পাহাড় অরণ্য ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। আইয়ুব বাচ্চু যেখানেই ঘুরে বেড়াতে যেতেন সঙ্গে থাকতো গিটার। সবাই যখন মুগ্ধ প্রকৃতি দেখায় ব্যস্ত তখন আইয়ুব বাচ্চু গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গিকে প্রস্তাব দিলেন ‘জঙ্গি ভাই এমন সুন্দর পরিবেশে গান ছাড়া কি চলে? চলুন আমরা কোনো গান তোলার চেষ্টা করি’।

রূপালী গিটারের যাদুকর প্রয়াত কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চু

 

আইয়ুব বাচ্চুর প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গি লিখেন…‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে/মায়াবী সন্ধ্যায় চাঁদজাগা একরাতে/একটি কিশোর ছেলে, একাকী স্বপ্ন দেখে/হাসি আর গানে সুখের ছবি আঁকে/আহা কি যে সুখ।’

 

সেই ঘুমভাঙা শহরে কিশোর ছেলের স্বপ্নের পেছনেই সারা জীবন ছুটে চলেছেন আইয়ুব বাচ্চু। নিজের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ব্যান্ড দল ‘ইয়োলো রিভার ব্যান্ড’। কিন্তু বিদেশের এক প্রোগ্রামে গিয়ে দেখেন ভুল করে তার দলের নাম লেখা হয়েছে ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। কিন্তু নামটি আইয়ুব বাচ্চুর ভালো লেগে যায়, তাই নিজ দলের নাম বদলে রাখেন ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। পরে জানা যায় ওই নামে অস্ট্রেলিয়ান একটি ব্যান্ড আছে। তাই আবারও নাম পাল্টিয়ে রাখা হয় ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’ বা এল আর বি।

 

‘এল আর বি’ প্রথম ব্যান্ড অ্যালবাম ‘এল আর বি’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। এটি বাংলাদেশের প্রথম দ্বৈত অ্যালবাম। এ অ্যালবামের ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হকার’ গানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৩ ও ৯৪ সালে তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যান্ড অ্যালবাম ‘সুখ’ এবং ‘তবুও’ বের হয়।

 

১৯৯৫ সালে বের হয় আইয়ুব বাচ্চুর সর্বকালের সেরা একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’। এ অ্যালবামের ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’, ও ‘আমিও মানুষ’ গানগুলো তুমুল জনপ্রিতা পায়। ২০০৮ সালে বের হয়েছিল সর্বশেষ অ্যালবাম ‘স্পর্শ’।

 

তবে জীবনের শেষ দিকে দেশের অডিও বাজার নিয়ে বেশ হতাশ ছিলেন খ্যাতিমান এ সঙ্গীত শিল্পী। চট্টগ্রামের ছেলেটি চট্টগ্রামের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। চট্টগ্রামের তরুণ শিল্পী এবং ব্যান্ড সংগীতে আগ্রহীদের জন্য ‘এবি লাউঞ্জ’ নামে নতুন একটি প্লাটফর্ম তৈরির কাজ শুরু করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে ব্যান্ডসংগীত ও শিল্প চর্চার জন্য একটি মিউজিক্যাল একাডেমি করার ইচ্ছা ছিল তার।

 

গত ২৪ আগস্ট আইয়ুব বাচ্চু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি চট্টগ্রামের সন্তান। তাই চট্টগ্রামের জন্য কিছু করে যেতে চাই। আমি সারাজীবন গাইতে পারব না। কিন্তু আমি চাই চট্টগ্রাম থেকে আমার মতো আরও কেউ উঠে আসুক। চট্টগ্রামের উদীয়মান শিল্পীদের জন্য আমি একটা প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়ে যেতে চাই। চট্টগ্রামে এবি লাউঞ্জ হবে ব্যান্ড সংগীত এবং উদীয়মান ব্যান্ড শিল্পীদের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার।’

হিমঘরে রাখা শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ

 

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জনপ্রিয় ব্যান্ড এলআরবি’র এই লিড গিটারিস্ট। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো দেশজুড়ে। তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন কিংবা থাকবেন আজীবন তা স্যোশাল মিডিয়া ফেসবুক, টুইটার সহ বিভিন্ন মাধ্যমে তার ভক্তদের স্ট্যাটাস আর ভালবাসা কথা গুলো দেখে’ই আর বুঝতে বাকি নেই। কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর হঠাৎ এই চলে যাওয়া যেন কিছুতেই মানতে পরছেন না তার ভক্তরা, অনুরাগী, অনুসারী সহ সকল শিল্পী ও শিল্পী জগতের কলাকৌশলীরা।

বাঙ্গালীদের বিশ্বকাপ কোয়ার্টারে শেষ হয়ে গেছে !

 

সিটিজি বাংলা: স্পোর্টস ডেস্ক:

বাঙ্গালীদের বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। সবচেয়ে বড় পতাকাটা কে লাগালো? কার জার্সিটা কত সুন্দর? কে ফেসবুকে কত বড় স্ট্যাটাস লিখতে পারলো? বিশ্বকাপ এলে পাড়া-মহল্লায় এমন কত উত্তেজনা, প্রতিযোগিতা। প্রিয় দলের জার্সি, পতাকা, ফেস্টুনের প্রতিযোগিতা শুরু হয় বিশ্বকাপের একমাস আগে থেকে। জমি বিক্রি করে কয়েক কিলোমিটার লম্বা পতাকা, পতাকার রঙয়ে বাড়ির রঙ করা- কত কিছু!

 

সারা বিশ্বে যতটা না বিশ্বকাপের রঙ লাগে, তার চেয়ে বেশি রঙ লাগে বাংলাদেশে। প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটাতে তৈরি হয় এই বাংলাদেশের মানুষ। এ দেশের মানুষের বিশ্বকাপ উন্মাদনা ছুঁয়ে যায় সারা বিশ্বকে। ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাত টিভি চ্যানেল ও’গ্লোবো থেকে সাংবাদিক আসে বিশেষ রিপোর্ট করার জন্য। নানান দেশের রাষ্ট্রদূতেরা ছুটে যান এসব পাগলামি দেখার জন্য।

 

 

বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না, খেলার সুযোগ পায় না। আদৌ কখনও পাবে কিনা সন্দেহ; কিন্তু এই দেশের মানুষ খুব অনায়াসেই নিজেদেরকে বিশ্বকাপের কেলেন্ডারে প্রবেশ করিয়ে ফেলেছে, নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে পাগলামির কারণে। এ দেশের মানুষ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে যে ধরনের পাগলামি করে, তেমন পাগলামি খোদ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাতে হয় কি না সন্দেহ।

 

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পাশাপাশি বাংলাদেশে দর্শক তৈরি হয়েছে জার্মানি, স্পেন কিংবা পর্তুগালের মত দলগুলোর। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিংবা ইনিয়েস্তাদের ব্যক্তিগত সমর্থনও কম নয়। রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশের সমর্থকদের বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গিয়েছিল।

 

 

কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপ যেন জায়ান্ট বধের খেলায় মেতেছিল শুরু থেকেই। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় করে দিয়েছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে। ৮০ বছরের রেকর্ড ভেঙে জার্মানরা গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার মত দলের কাছে হেরে। কোনোমতে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেনের মতো দলগুলো।

 

কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে অঘটন ঘটিয়ে দেয় রাশিয়া। টাইব্রেকারে বিদায় করে দেয় স্পেনকে। ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেয় সবচেয়ে দর্শক নন্দিত দল আর্জেন্টিনাও। মূলত আর্জেন্টিনার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের অধিকাংশ সমর্থকের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।

 

 

তবুও আশা ছিল ব্রাজিলকে নিয়ে। যারা আর্জেন্টিনা সমর্থক ছিল, তারা অন্তত ব্রাজিল বিরোধীতার জন্য হলেও খুব আগ্রহভরে টিভির সামনে বসতো খেলা দেখার জন্য। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে এসে বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সব রঙ হারিয়ে গেলো। বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় ঘটে গেলো বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলের।

 

 

 

কাজান এরেনায় বেলজিয়ামের বিপক্ষে তুমুল আক্রমণের পসরা সাজিয়েও একটির বেশি গোল আদায় করতে পারেনি ব্রাজিল। নেইমার-কৌতিনহো-উইলিয়ান-ফিরমিনোরা একের পর এক আক্রমণ করেও পারেনি বেলজিয়ামের রক্ষণ ভাঙতে। আবার দুর্ভাগ্যও ভর করেছিল ব্রাজিলের ওপর। না হয়, বারে লেগে কেন বল ফিরে আসবে। কেন ফাঁকা পোস্ট পেয়েও শট নিতে পারবেন না পওলিনহো, কৌতিনহোরা!

 

 

শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের হার ২-১ গোলে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের অগণিত ভক্ত-সমর্থক, আর্জেন্টিনা বিদায়ের পরও যাদের কাছে বিশ্বকাপের রঙটা টিকেছিল, আজ থেকে সব ফিকে হয়ে গেলো। বিশ্বকাপের রঙ হারিয়ে গেলো। কোয়ার্টারেই শেষ হয়ে গেলো বাঙালির বিশ্বকাপ। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বের কাছেও বিশ্বকাপের রঙ পুরোপুরি ফিকে হয়ে গেছে!