চট্টগ্রামের পাঠকপ্রিয় অনলাইন

মহান মুক্তিযুদ্ধ

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চাটগাঁইয়া ছড়া : ‘মুজিব আছে’

সিটিজি বাংলাঃ

মুজিব আছে
— মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন
——————————–

বঙ্গবন্ধু মুজিব আছিল্
আইজু আছে মনত্-
মুজিব পুরাই চেতনার নাম
থাইবু অক্কল সমত্।

বেশি মানইনষুর দরহার নাই
উগ্গা মুজিব চাই-
এন্ডে তোয়াই, অন্ডে তোয়াই
আঁর মুজিবতো নাই।

গোডা বাংলা তোয়াইয়েনে
নপাই তোয়ারে-
পঁচাত্তরত হতি গইরলো
মোস্তাক গোঁয়ারে।

এহনতো ডরত আছি
আশপাশে দালাল
তারারে দেই টাহর নপাইবা
হনে হারাম, হনে হালাল।

মুজিব তুঁই মনত আছে
গভীর এক্কান জাগাত্-
তুঁই মনত থাকিবারে
যদিও আইয়্যে আঘাত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে নিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ছড়াটি লিখেছেন আনোয়ারা উপজেলার সাংবাদিক মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন।

আগস্ট কেন শোকের মাস?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (সর্ব ডানে) সহ বঙ্গবন্ধুর স্ব-পরিবারের ঐতিহাসিক ছবি।

সি টি জি বাংলাঃ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হলেও পুরো আগস্ট মাসকেই বাঙ্গালী জাতি শোকের মাস হিসাবে পালন করে। কারন এ মাসে আমরা হারিয়েছি বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাঁকে স্ব-পরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল পরিবারের নারী-শিশু সবার ওপর। এমনকি ঘাতকের নির্মমতা থেকে রেহাই পায়নি ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলও।

এরপরও থেমে থাকে নি নির্মমতা। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তারিখে জাতির জনকের কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হলে ঘটনাস্থলে ২৪ জন নিহত হয়। আহত হয় আরও তিনশ নিরীহ নেতা-কর্মী। হামলায় গুরুতর আহত আওয়ামী লীগের মহিলা নেত্রী ও প্রয়াত রাষ্টপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী আইভী রহমান ২৪ আগস্ট নিহত হন।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট তারিখে ন্যাক্কারজনকভাবে সারা দেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা করা হয়েছিল। এসব বর্বরোচিত বোমা হামলায় বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ তখন ৩৩ জন প্রাণ হারান। আহত হন চার শতাধিক নারী-পুরুষ।

এছাড়াও এ আগস্ট মাসে আমরা যাদের হারিয়েছি:
বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা হারিয়েছি ১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট আমদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে হারিয়েছি ।

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট আমরা হারিয়ছিলাম বীরশ্রেষ্ট মতিউর রহমানকে।

২১ তারিখে ২০০৮ সালে আমরা হারিয়েছি চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতাএবং নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে।

এ মাসে আরেকটি শোক গাঁথা রচিত হয়েছিল ১১ই আগস্ট ২০০৪ সাল। সেদিন মারা গিয়েছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট আমরা হারিয়েছি দুই কিংবদন্তি তারেক মাসুদ ও মিশুক মনিরকে।

৪ আগস্ট ২০১২ সালে আমাদের কাঁদিয়েছে অন্যতম ক্রীড়াবিদ আব্দুল হামিদ যিনি ছিলেন বাংলা ধারাভাষ্যের পথিকৃৎ।

এ মাসে আমরা হারিয়েছি ২৬শে আগস্ট আতুল প্রাসাদ, ৬ইআগস্ট সুরেন্দ্র ব্যানার্জীসহ আর অনেককে।

ভারতীয় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে হারিয়েছি ১১ আগস্ট ১৯০৮ সালে।

এক কথায় ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় এ মাস আমদের কাঁদবার মাস।

তবে এ মাসে কেউ আনন্দ উল্লাসে মেতে ভূয়া জন্মদিন পালন করবে এটা কারোরই কাম্য হতে পারে না।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া ও টেকনাফ নিউজ৭১

 

ভারতীয় ৭ শহীদের স্বজনদের ক্রেস্ট দেবেন প্রধানমন্ত্রী

নয়াদিল্লি থেকে: আসন্ন ভারত সফরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী সাত ভারতীয়র স্বজনদের হাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
 
এই সাত শহীদ হচ্ছেন, ল্যান্স নায়েক অ্যালবার্ট এক্কা, মেজর অনুপ সিং, সেপাই অংশুয়া প্রসাদ, লে. সমীর দাস, স্কোয়াড্রন লিডার এ বি সামন্ত, ল্যান্স নায়েক মোহিনী রঞ্জন চক্রবর্তী ও সুবেদার মালকাত সিং।
 
ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (প্রেস) ফরিদ হোসেন বলেন, ৮ এপ্রিল বিকেল সাড়ে তিনটায় দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে মানেকশ সেন্টারে শেখ হাসিনা ৭১’ এ শহীদ ভারতীয় যোদ্ধাদের স্বজনদের হাতে সিলভার ক্রেস্ট তুলে দেবেন। নরেন্দ্র মোদিও উপস্থিত থাকবেন সে সময়।
 
ফরিদ হোসেন বলেন, এটি অনেকটা টোকেন সম্মান প্রদর্শন। এরপর বিভিন্ন সময়ে বাকি শহীদের ১৬৬১ পরিবারকে ক্রেস্ট ও অর্থ তুলে দেওয়া হবে।

স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু

বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন ও লালিত স্বপ্ন স্বাধীনতা। দীর্ঘ ২৩ বছর রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতার চূড়ান্তদ বিজয়। বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি এবং স্বপ্নগ্রষ্টা। স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ২৩ বছর অনবরত শত নির্যাতন, জেল জুলুম অসংখ্যবার কারাবরণ করেছেন। তিনি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ এক মহাকাব্য আর সেই মহাকাব্যের নায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ঘটান বঙ্গবন্ধু। এর পরিণতিতে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর মতো সাহস আর কারোর মধ্যে দেখা যায়নি। ফাঁসির মঞ্চ থেকে তিনি একাধিকবার ফিরে এসেছেন, আপোস করেননি। আর সেই স্বাধীনতার শক্তি আর বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনাকে লালন করে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও আমরা আমাদের স্বপ্নপূরণ করতে পারিনি।

স্বদেশবিরোধী কুচক্রী মহলের কর্মকা-, দলতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র ও সুশাসনের অভাব আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ও সোনার বাংলা গড়ায় বড় ধরনের বাধা। ৪৪ বছরে আমাদের যতটুকু এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল তা হয়নি, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে যে রাজনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তা আমাদের উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করেছে। দূরে সরে গেছে অনেকখানি স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য থেকে। আর বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস মুছে ফেলতে চেয়েছে। শেষ পর্যন্তদ পারে নি। আবার কখনো সামরিক শাসন আবার কখনো স্বৈরশাসক শাসনে ভুগতে হয়েছে বাঙালিকে। এ সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসেন তিনি। পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন দেখা গেছে আজকের প্রজন্মের মাঝেও।

আজকের প্রজন্মকে বুঝতে হবে, ইতিহাসবিদরা দেশের জন্য স্বপ্ন দেখেন না। দেশের জন্য স্বপ্ন দেখেন রাজনীতিবিদগণ। এ স্বপ্নে আর্দশ থাকে, দর্শন থাকে। এ রকম স্বপ্ন যাঁরা দেখেন তাঁরাই স্বাপ্নিক। সেই স্বাপ্নিক রাজনীতিবিদগণই ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ইতিহাসবিদরা ইতিহাস সৃষ্টি করেন না, তারা কেবল ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন ও বিশ্লেষণ করেন। আজকের প্রজন্মকে আরও বুঝতে হবে, অবিসংবাদিত রাজনীতিবিদ হিসেবে বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও সংগ্রামের দীর্ঘ পথচলায় যে কয়টি তারিখ উজ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে, একাত্তরের ২৬ মার্চ তার অন্যতম। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য বাঙালি জাতির গভীর আবেগজড়িত বিজয়গাথার নাম একাত্তর। একাত্তরে নয়মাস মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এবং এই একাত্তরে (১৯৭১ সাল) বাংলাদেশ পরাধীন থেকে স্বাধীন হয়েছে। একাত্তর হঠাৎ করে আসেনি। সুদীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে এমন এক পর্যায়ে আসে একাত্তর, আর সেটাই হয় বাঙালির স্বপ্ন-স্বাধীনতার আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্তদ পর্ব।

একাত্তরের ইতিহাস লিখতে গেলে যে পরিসরেই হোক না কেন, তার সঙ্গে লিখতে হবে তার পূর্ববর্তী ইতিহাসও। পাকিস্তান সৃষ্টির সাত মাসের মধ্যেই বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাঙালি সোচ্চার হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিকে এমনভাবে একাট্টা করেছিল যে, তার দু’বছরের মাথায় নির্বাচনে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম লীগকে রাজনীতিভাবে এদেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুলভাবে বিজয়ী হয়ে পূর্ব বাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) উন্নয়নে কাজ করার গণরায় পেলো। বাঙালিরা প্রাদেশিক সরকার গঠন করে।

মাত্র ৫৫ দিনের মাথায় নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে অন্যায়ভাবে বাতিল করে পাািকস্তানি শাসকগোষ্ঠি। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে কাজ করতে দেয়া হলো না। সেই সাথে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বাঙালির গণতন্ত্রের আকাক্সা।

১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণ পরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র বিল পাস করা হয়। এ শাসনতস্ত্রে বাংলার (এ দেশের) দাবি উপেক্ষিত হওয়ার প্রতিবাদে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সদস্যগণ পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেন।

এভাবে বাঙালির দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদে শেখ মুজিব তাঁর দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে নিজেকে একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাপতি ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয়। এই সামরিক জান্তদা গণতান্ত্রিক শক্তিকে ধ্বংস করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। গায়ের জোরে দেশ চালাতে লাগেন। রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার, নির্যাতন ও নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে আইয়ুব খান একরকম ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকদের নিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে। আইয়ুব খান প্রবর্তন করে এক নতুন পদ্ধতি ‘মৌলিক গণতন্ত্র’। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃাষ্ট করা হলো। এর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা প্রতিবাদে ফুঁসে উঠতে থাকে।

১৯৬১ সালের শেষ দিকে সামরিক জান্তদা আইয়ুব খান ও সামরিক আইনের বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম তীব্রতর হতে শুরু করে। বাঙালির ঐতিহ্য পরিপন্থী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করে। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়। বাঙালির বিজয় হয় এই আন্দোলনে। গত শতকের যাট দশকের প্রথম পর্বে বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মূল সংগঠকরূপে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৬৩ সালে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে তিনিই মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাঙালি এ ক’বছর রাজনৈতিক ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে। বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের উৎসাহে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় সশস্ত্র সংগ্রামের একটি বিপ্লবী প্রক্রিয়া, সেটি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ বা নিউকিয়াস বলে খ্যাত। এ নিউকিয়াসের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ। এ সংগঠনের পরবর্তী নেতৃত্বে যুক্ত হন শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমদ। এ নিউকিয়াসের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা। সারাদেশব্যাপী শিক্ষা আন্দোলনসহ সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে নিউকিয়াসের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালির নিরাপত্তা বিধানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

স্বৈরাশাসক সামরিক জান্তদা আইয়ূব খান এ দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে বাঙালিকে শৃঙ্খলিত করার ষড়যন্ত্রে যখন লিপ্ত তখন ১৯৬৬ সালে ৫ফেব্রুয়ারি লাহারে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর এক কনভেনশনে স্বাধিকারের দাবি সংবলিত বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা উত্থাপন করেন। এদিকে ছয় দফা কর্মসূচি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এ ছয় দফা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ। এজন্য বঙ্গবন্ধু ছয় দফা সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন’ ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’

ছয় দফার পক্ষে জনমত সংগঠিত করার লক্ষ্যে সারাদেশে পঁয়ত্রিশ দিনে বত্রিশটি জনসভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন। জনমত প্রবল হয়ে ওঠায় বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের ওপর নেমে আসে গ্রেফতার ও নিমর্ম নির্যাতন। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পরও ৬ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৬৬ সালের ৭জুন সারা বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট (হরতাল) পালিত হয়।

৭ জুনের সাধারণ ধর্মঘটের সময় পুলিশের গুলিতে সরকারি হিসেবমতে ১০ বাঙালি নিহত হয়। এরপর পাকিস্তান সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সঙগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ সর্বদাই বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ছায়াতলে নীরবে কাজ করেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিতপ্রাণ। দলের সংগ্রামে ও সংকটে তাজউদ্দীন আহমদ হাল ধরেন।

রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং (আগরতলা ষড়যন্ত্র বলে খ্যাত) মামলায় অভিযুক্তদের সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধ-নিবন্ধে লেখনীর মাধ্যমে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে স্বাধীনতাকামী ও মুক্তিকামী সেনা নেতৃত্ব তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ মুজিবকে অনুরোধ করেন। এ ঘটনাটি পাকিস্তানি গোয়েন্দার কাছে ফাঁস হয়ে যায়। এর পরিণতিতে বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কঠিন শাস্তি দেয়ার জন্য দায়ের করা হল আগরতলা মামলা (পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির দৃষ্টিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আর বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা)।

আসামী করা হল বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ ও বাঙালি জাতীয়তাবোদের চেতনায় বিশ্বাসী অনেক দেশপ্রেমিককে। এই মামলাকে কেন্দ্র করে বাংলার জনমনে তীব্র অসন্তেদাষ সৃষ্টি হয়। বাঙালি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। দেশের সর্বত্র শ্লোগান ওঠে ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’

১৯৬৯ সালে আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য দেশের ছাত্র সমাজ এগারো দফা কর্মসূচী ঘোষণা করে। শুরু হল ছয় দফার আন্দোলনের সঙ্গে এগারো দফার আন্দোলন। পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্তদ শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল নেতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

২২ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালির নয়নমনি শেখ মুজিবকে মুক্ত করে আনে। ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক বিরাট সংবর্ধনা সভায় বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হলেন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভের পর আন্দোলন-সংগ্রাম বেড়ে যায়। অন্যদিকে ১৯৬৯ সালে ২৫ মার্চ আাইয়ুব খান পাকিস্তানের সেনাবহিনীর প্রধান জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নিল।

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু এ দেশের নাম রাখেন বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে পূর্ব বাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ। এদিকে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হল সাধারণ নির্বাচন। সে নির্বাচনে বাঙালির বিপুল ভোটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃতে ¡আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন হয়। এ বিজয় ছিল ছয় দফার রাজনৈতিক বিজয়।

একদিকে বাঙালির বিজয় অন্যদিকে বাঙালির বিজয়কে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তদা ও পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো চক্রান্তদ করতে থাকে। বাঙালির বিজয়কে তারা মেনে নিতে পারেনি। একাত্তরের ১মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে বাঙালি বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে এসে এর প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। উচ্চারিত হতে থাকে স্বাধীনতার শ্লোগান : ‘জয় বাংলা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’

এলো ৭ মার্চ। এই দিনটি ছিল স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। একাত্তরের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো বাঙালির সামনে স্বাধীনতার ডাক দেন। বাঙালি সেদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো আবিষ্ট হয়েছিল রাজনৈতিক কবি বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠে। আর তাঁর এই ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে দারুণভাবে আন্দোলিত করে। তাঁর ভাষণে যুদ্ধের প্রস্তুতির কথাও ছিল: ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবেৃ।’ সেদিনের ভাষণে সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল : ‘ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে যে দেশটি আজ প্রতিষ্ঠিত তার অবয়ব তৈরির কাজটি করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে।

১৯ মার্চ ১৯৭১। এটি বাঙালির জাতীয় চেতনার একটি অবিস্মরণীয় দিন। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাতদিন আগেই বীরপ্রসবিনী জয়দেবপুরের মাটিতে শুরু হয় সংগ্রামী শ্রমিক-ছাত্র-জনতার প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। আর পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে এই জয়দেবপুরেই (বর্তমান গাজীপুর) প্রথমে গর্জে ওঠে বাঙালির অস্ত্র। জয়দেবপুরের সর্বদলীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সাহসী ভূমিকার কারণে সেদিন জয়দেবপুরের সর্বস্তরের জনতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। ১৯ মার্চের পর থেকে সারাদেশে শ্লোগান ওঠে ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’

২৩ মার্চ ১৯৭১। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ এদিন পালন করেছে বাংলাদেশ দিবস হিসেবে। সেদিন পাকিস্তান দিবস হিসেবে পালনের কথা থাকলেও সেদিন তা হয়নি। এদিকে সেদিন বাংলার ঘরে ঘরে বাংলাদেশের নতুন পতাকা উড়েছে। দু-একটি জায়গা ছাড়া কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখা যায়নি। আর এই দিনেই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সূর্যোদয়ের পর তাঁর বাসভবনে (ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডস্থ) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

এলো ২৫ মার্চ। বাঙালির ইতিহাসে কালরাত্রি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানি সামরিক শাসক তার বর্বর বাহিনী নিয়ে অপারেশন সার্চ লাইট নামে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানী বাহিনী রাতের আধারে প্রথমে ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে। পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে একাত্তরের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার গোষণাটি দ্রুত তৎকারীন ইপিআর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়।

স্বাধীনতা ঘোষণা হওয়ার পরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি কমান্ডো দল বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার কারণেই আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষিতে লাখ লাখ বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। সে সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার প্রচেষ্টা চালায়। গোটা দেশ রণাঙ্গনে পরিণত হয়। এদিকে ২৬ মার্চের দুপুর ২:৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র (আগ্রাবাদ) সর্বপ্রথম চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার গোষণা পাঠ করেন।

এক্তাত্তরের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি মানসিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। মার্চের শেষের দিকে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাঙালিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করে। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। কৃষকÑশ্রমিক ও ছাত্ররা এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নিমিত্তে মুক্তিবাহিনীতে স্বতঃর্স্ফুতভাবে অংশগ্রহণ করতে থাকে। একদিকে বাঙালিরা প্রতিশোধ-স্পৃহায় উন্মত্ত, অন্যদিকে দেশকে শত্রুমুক্ত করার কামনায় উত্তপ্ত, ক্ষোভ-ক্রোধ ও আবেগে উত্তেজিত। দেশকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল মুক্তিকামী বাঙালি।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের আকাক্সক্ষা এই দেশের মানুষের মধ্যে জাগ্রত করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যে মানুষটি এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন, তিনি হলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ৩ এপ্রিল দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন।

ঐ বৈঠককালে তাজউদ্দীন মনস্থির করেন, যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে সরকার গঠনের বিকল্প নেই, আর তা না হলে বহির্র্বিশ্বের সাহায্য-সহযোহিতা পাওয়া যাবে না। একাত্তরের ১০ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলেন উপরাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধরু অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

১৭ এপ্রিল প্রথম বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাঙালিদের অতর্কিত আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য মে মাসের মধ্যে তাদের নিজস্ব শক্তি বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা চালায়। মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপক ও জোরদার করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার এগারোটি সেক্টরে বিভক্ত করে।

বাংলাদেশে গণহত্যা শুরুর পর ভারত ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেও য়ুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তদরীণ বিষয়’ বলে উল্লেখ করে। যুক্তরাষ্ট্র , চীন ও পৃথিবীর প্রায় মুসলিম দেশ পাকিস্তানের পক্ষে থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। রাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানকে সহযোগিতা করে। কিন্তু ঐ দেশের জনগণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন উপায়ে সহযোগিতা করেছে। একাত্তরের ১১আগস্ট পাকিস্তানের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে সামরিক আদালতে গোপনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হয়। বিচারের নামে চলে প্রহসন। এদিকে দেশে চলতে থাকে ছোট ছোট যুদ্ধ। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাঙালিরাই প্রথম জাতি. যারা সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতার চূড়ান্তদ বিজয় অর্জন করেছে।

আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। আজ বিনম্র শ্রদ্ধায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চার নেতাদের স্মরণের দিন। স্মৃতিচারণের দিন। স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সম্মান জানানোর দিন। আজকের প্রজন্মকে জানতে হবে বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে। তাঁর আদর্শ ও চেতনাকে বুকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর ন্যায় স্বদেশকে ভালবাসতে হবে।

অন্যদিকে আর ছয় বছর অতিক্রান্তদ হলেই বাঙালি জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তদী পালন করবে। আবার এর মধ্যে আমরা ক্রমশ: হারাতে থাকবো একাত্তরের আগের বীর সংগ্রামী সন্তদান ও একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। ইতোমধ্যে অনেক বীর সেনানীদের হারাতে হয়েছে। এখন বাংলাদেশে একাত্তরের পরে জন্ম নেওয়া নাগরিকই বেশি, যাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতা নেই। ধীরে ধীরে এ জাতিকে আন্দোলন-সংগ্রামের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যেতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতা আন্দোলনৈ-সংগ্রামের অকুতোভয় বীর সন্তদান ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যাঁরা জীবিত রয়েছেন, তাঁদের সান্নিধ্যে বেশি বেশি করে আসতে হবে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বহুবছর নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ভুলপাঠ হাজির করা হয়েছে। সে দিকে নজর রেখে বাংলাদেশের শেকড়ের সন্ধান করে জানতে হবে স্বাধীনতার ইতিহাসের ইতিকথা ও বিস্তারত পটভূমি। জানতে হবে তাঁদের কথা, যাঁদের আন্দোলন-সংগ্রামের ফল হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে একদিন লাল-সবুজের পতাকা জয়যুক্ত হয়েছিল। আজকের তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনচেতা হয়ে ২০১৩ সালে যেভাবে এগিয়ে এসেছে, সেই দৃষ্টান্তদকে সামনে রেখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ চেতনা সজাগ থাকে সে রকম দৃষ্টান্তদমূলক কর্ম সম্পন্ন করতে হবে।

ঘুরে দাঁড়াতে হবে সকল অনাচার, সকল অপকর্ম ও সকল দুরাচারে বিরুদ্ধে। মেধা-মনন, সাহস ও সত্যনিষ্ঠায় নিজেকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সেই সাথে সার্থক হবে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মদান আর অগণিত মানুষের অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, অর্জন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাহলেই সার্থক হবে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের সব আনুষ্ঠানিকতা।

[লেখক: কলেজ শিক্ষক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক এবং আর্কাইভস ৭১ এর প্রতিষ্ঠাতা।]

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আখতারুজ্জামান বাবু

নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রামের আনোয়ারার হাইলধর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে সম্ভবত ১৯৩৮ সালে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এবং সকলের প্রিয় বাবু ভাই জন্মগ্রহণ করেন। বিভিন্ন পত্রিকা এবং তাঁর পরিবারের পক্ষ হতে প্রাপ্ত তথ্য মতে এটি সঠিক তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নস্থানে তাঁর জন্ম সাল বিভিন্নভাবে লেখা হয়েছে।

সংবাদপত্রের এক স্থানে জন্ম সাল ১৯৪৩ বলে উল্লেখ করেছে। পাসপোর্ট ও বিভিন্ন দলিল ডাটাবেজ অনুযায়ী আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৪৫ এর ৩ মে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম নুরুজ্জামান চৌধুরী, তিনি ছিলেন পেশায় একজন আইন ব্যবসায়ী। মাতা খোরশেদ আরা বেগম। বাবু স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। ১৯৫৮ সালে পটিয়া হাই স্কুল হতে তিনি সফলতার সাথে মেট্রিক পাস করেন। স্কুল জীবন হতেই তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ছাত্র রাজনীতির একজন সফল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ১৯৫৮ সালে তিনি চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন।
মেট্রিক পাস করার পর বাবু ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন সময়ে তিনি আমেরিকায় পড়াশোনার জন্য স্কলারশীপ পান। আমেরিকার ইউনিয়ন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এ টেকনোলজিতে ভর্তি হন এবং ছয় মাস পর নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস্ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন এ লেখাপড়া শুরু করেন। এ ইউনিভার্সিটি হতে এসোসিয়েট ডিগ্রী নিয়ে ১৯৬৪ এর ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেই বড় ভাই এবং সে সময়কালের নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যাক্ষ ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বশিরুজ্জামান চৌধুরীর সাথে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন এবং একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নেন। বড় ভাইয়ের ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের একজন যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে বাবু নিজেকে গড়ে তোলেন। স্বাভাবিকভাবে সে ধারাবাহিকতায় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৬৭ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ বশিরুজ্জামান চৌধুরী অল্প বয়সে লন্ডনে আকস্মিক মৃত্যু বরণ করলে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব পুরোটাই তাঁর কাঁধে এসে পড়ে এবং তিনি সফলতার সাথে আমৃত্যু এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ১৯৬৭ এর পর হতে তিনি আওয়ামী লীগের একজন সুদক্ষ কর্মী হিসেবে এবং বাংলার স্বাধীকার আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হতে আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া হতে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময়ে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ মহকুমা ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদকের কঠিন দায়িত্বও পালন করেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাক্কালে এ তরুণ নেতার ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণযোগ্য। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেশের জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধুর এ নির্দেশে সাড়া দিয়ে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নিজ নির্বাচনী এলাকা আনোয়ারা, কর্ণফুলী থানা ছাত্রলীগ ও আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সাথে সংযোগ রক্ষা করে ছাত্র যুবকদেরকে আসন্ন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন। সে সময় তিনি প্রত্যন্ত এলাকায় গণ-সংযোগ ও সমাবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনতাকে সংগঠিত করেন।
চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটাস্থ তাঁর বাসভবন ‘জুপিটার হাউস’ তখন চট্টগ্রামের স্বাধীনতাকামী ও আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের জন্য এক অঘোষিত কার্যালয়ে পরিণত হয়। যা সম্ভব হয়েছে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মেধা, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও যোগ্যতার কারণে। সে সময় চট্টগ্রাম হতে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এম.এলএ এবং এমপিএ সহ সকল নেতৃবৃন্দ এ ‘জুপিটার হাউসে’ বসেই মুক্তিযুদ্ধে করণীয় ও পরবর্তী কর্মসূচি প্রভৃতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বর্বর হত্যাকাণ্ড শুরু করে। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে তাঁর বাস ভবন ‘জুপিটার হাউসে’ সে সময়কার চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি এম. আর সিদ্দিকী, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম. এ. হান্নান, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আতাউর রহমান খান কায়সার, অধ্যাপক পুলিন দে সহ চট্টগ্রামের সকল এম. এল. এ ও এম.পি এ ও চট্টগ্রামের সকল সিনিয়র নেতাদের এক জরুরি সভা বসে। নেতৃবৃন্দ এ সভা হতে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী করণীয় কর্মসূচী নির্ধারণ করেন। এ বৈঠকে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর উপর দায়িত্ব দেয়া হয় চট্টগ্রাম বিমান বন্দর উড়িয়ে দেয়ার। ২৬ মার্চ সকালে তিনি ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে সাতকানিয়া বায়তুল ইজ্জত হতে বিস্ফোরক দ্রব্য আনার দায়িত্ব পালন করেন।
২৯ মার্চ তাঁর আপন ছোট ভাই বশরুজ্জামান চৌধুরীকে নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দেন। বশরুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সামগ্রী সফলভাবে পৌঁছে দিয়ে চট্টগ্রাম আসার পথে মোমিন রোড এলাকায় পৌঁছালে পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়েন এবং পাক সেনাবাহিনীর গুলিতেই তিনি এখানেই শহীদ হন। সে সময়কালের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত বিভাগের অবসর প্রাপ্ত এডিশনাল চীফ ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদ হাসান সিরাজী আমাকে এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। সে সময় তিনি এ এলাকায় অবস্থান করছিলেন। সিরাজী সেদিনের পুরো ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। বশরুজ্জামান চৌধুরীই হলেন চট্টগ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর সামনাসামনি আক্রমণের প্রথম শহীদ।
হাইলধর গ্রামের পৈতৃক কবরস্থানে ছোট ভাইয়ের লাশ দাফন করে পরদিন যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অন্যান্য আনুসাঙ্গিক বিষয়ে জানার জন্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে আসেন। এখানে মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে তাঁর দেখা হয়। কালুরঘাটের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এবং নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করে তিনি পুনরায় চলে আসেন নিজ গ্রামে। নিজ গ্রামে স্থানীয় নেতা কর্মীদের সাথে বৈঠক করে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং এ উদ্বুদ্ধ করে এবং তাদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে তিনি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পুনরায় সাতকানিয়ার বায়তুল ইজ্জতে চলে আসেন। সেখানে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সকল এম. এল. এ ও এমপিদের এক জরুরি বৈঠক বসে। এ বৈঠকে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরীকে আঞ্চলিক কমাণ্ডার নিয়োগ দিয়ে দক্ষিণ জেলার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটিতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন।
সে সময় চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাদের গোপন আস্তানা নামে খ্যাত পাথরঘাটাস্থ ‘জুপিটার হাউসে’ আখতারুজ্জামান চৌধুরী সহ সকল আওয়ামী লীগ নেতাদের একত্রে হত্যার উদ্দেশ্যে পাক বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায়। সোভাগ্যক্রমে বাবু বা আওয়ামী লীগের কোন নেতা সে সময় ‘জুপিটার হাউসে’ ছিলেন না। পাক হানাদার বাহিনী কাউকে না পেয়ে ‘জুপিটার হাউস’ জ্বালিয়ে দেয়।
দেশের যুদ্ধকালীন এ কঠিন সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে সু-সংগঠিত করার জন্য বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদেরকে ট্রেনিং গ্রহণের জন্য সু-সংগঠিত করেন। পরবর্তীতে এম. ইদ্রিছ বিকম, এম এল এ আবু ছালেহ, সহ বিপুল সংখ্যকনেতা কর্মীদের সাথে নিয়ে দোহাজারী হতে পায়ে হেঁটে প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রায় সাতদিন পর ভারতে পৌঁছেন। ভারতে দেমাগ্রী ট্রেনিং ক্যাম্পে সকলকে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে ১৬ জুন কলিকাতায় বাংলাদেশ মিশনের অফিসে যান।
সে সময় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার আখতারুজ্জামান চৌধুরীকে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির দায়িত্ব দেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি ভারতের মারাঠা সম্প্রদায়ের নেতা কালা শাহ ধাঘরের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনতে সক্ষম হন। এর কিছু দিন পর তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে গমন করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষে কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন। এ লক্ষে তিনি সেখানে ১৭টির মত জনসভায় বক্তব্য রাখেন। সে সময় সেখানে অবস্থানরত এবং বাংলাদেশের পক্ষ্যে কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ে কর্মরত আবু সাঈদ চৌধুরীকে তিনি সহায়তা করেন। লন্ডনের হাইড পার্কে উল্লেখযোগ্য বাঙালিদের এক বিশাল জনসভায় আবু সাঈদ চৌধুরী, ফনীভূষণ মজুমদার ও আখতারুজ্জামান চৌধুরীর ন্যায় নেতাদের আবেগময়ী বক্তব্য বাঙালিদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশাল প্রভাব পড়ে।
সে সময় লন্ডনে সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথেও সাক্ষাৎ করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী। তিনি শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর লন্ডন ও আমেরিকায় ভ্রমণের বিষয়ে এবং সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানান। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পত্নি মিসেস নিক্সনের সাথে সরাসরি দেখা করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী। লন্ডন হতে তিনি পুনরায় ভারতে চলে আসেন এবং ত্রাণ কার্য পরিচালনায় নিয়োজিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে প্রবাসী সরকারের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে যে ভূমিকা রেখেছেন তা ইতিহাসে স্বণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি মূলত ছিলেন ব্যবসায়ী পরিবারের। কিন্তু ব্যবসার পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সমানভাবে সফল ছিলেন। এ সফলতা তিনি পেয়েছেন দেশের সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে। স্থির, বিচক্ষণ, শিক্ষা-দীক্ষা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা, স্থির সংকল্প ও কর্মকুশলতা এবং কঠোর শ্রম ও কাজের প্রতি আন্তরিকতা তাঁকে এ পর্যায়ে আসতে সহায়তা করেছে। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আওয়ামী রাজনীতিকে সক্রিয় রাখতে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। মেধা, প্রজ্ঞা, অর্থ, সর্বদিক দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে সহয়তা দিয়েছেন তিনি।
১৯৭৮ সাল হতে আমৃত্যু তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন। ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম ১২ আনোয়ারার সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ইতিমধ্যে তিনি দেশের আরেক স্বনামধন্য শিল্প উদ্যোক্ত চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর আহলার বিখ্যাত ইসলাম শিল্প গোষ্ঠীর কর্ণধার, বিশিষ্ট সমাজসেবক ও বিদ্যুৎসাহী ব্যক্তিত্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ২য় কন্যা নুর নাহার বেগম চৌধুরীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হানাহানির এ দুর্গন্ধময় অবস্থায় বাবু ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী রাজনৈতিক। ভিন্নাদর্শের নেতৃবৃন্দের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক বর্তমান সমাজে বিরল। ব্যক্তিগত জীবনে অমায়িক, সদালাপী, সজ্জন ও ভাল মানুষ হিসেবে তিনি সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। সহজেই সকলের সাথে মিশে যাওয়ার অসাধারণ গুণাবলী ছিল তাঁর। মেধা, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও যোগ্যতার কারণে তিনি দেশে বিদেশে সব মহলেই ছিলেন আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
স্বাধীনতা পরবর্তীতে দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়া হয়। সে সময় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা তিনি করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। এক কথায় বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথিকৃৎ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে স্বাধীনতা পরবর্তীতে চট্টগ্রামে লৌহজাত, তেল এবং গ্যালভেনাইজ ও ট্রেক্সটাইল শিল্পের একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পান। রাজনীতি ও ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদেরকে সংগঠিত করে তাদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদে কাজ করেছেন আন্তরিকতার সাথে। সাথে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ঐতিহ্যবাহী মযার্দাপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেন।
১৩/১২/১৯৮৫ হতে ১৯/০১/১৯৮৮ ইং পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষিতে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এবং শিল্পপতিদের সর্ব্বোচ্চ অভিভাবক সংগঠন এফ.বি.সি.সি.আইয়ের প্রেসিডেন্টর দায়িত্ব তিনি সফলতার সাথে পালন করেন। সে সময় ঢাকায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মত। সে সময়ে এফ. বি. সি. সি. আইয়ে তাঁর ভূমিকা আমাদেরকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছে। চেম্বার রাজনীতিতে তাঁর সফল নেতৃত্ব আজো ব্যবসায়ী সমাজে সকলের জন্য অনুকরণীয় দূষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ১৯৮৮-৮৯ সালের তিনি এফ.বি.সি.সি.আইয়ের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বের সাথে সাথে ৭৭ জাতি গ্রুপের ব্যবসায়ী সংগঠনের সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজকে সম্মানিত করেছেন।
রাজনীতির কারণে নির্যাতন, কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে। ৯০ এর দশকে পনের দলের নেতা হিসেবে তাঁর প্রজ্ঞাশীল নেতৃত্বে সকল মহলকে উজ্জীবিত করেছে। ফলে স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কম হয়নি। ষড়যন্ত্রের কারণে দীর্ঘ অনেক সময় প্রবাসে অতিবাহিত করতে হয়েছে। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও ধৈর্য দিয়ে সকল ষড়যন্ত্র ও পদদলিত করে জয়ী হয়েছেন। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার কলংকটিকাও লেপণ করা হয়েছে। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা দিয়ে কুচক্রি মহলের সকল ষড়যন্ত্রকে জয় করেছেন। এতেই তাঁর বিশাল নেতৃত্বের সফলতা।
২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্বও তিনি সফলতার সাথে পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লি. এর পরিচালনা পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ্, সমাজসেবক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সকল মহলের প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একটি সফল অধ্যায় শেষ করে ৪ নভেম্বর ২০১২ ইং তারিখে তাঁর প্রভূর সান্নিধ্যে চলে গেলেন।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্ধানে যাচাই

উদ্যোগ নেয়ার প্রায় দুই বছর পর শুরু হয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কার্যক্রম। শনিবার দেশের ৯৪ উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি শনিবার দেশের উপজেলা, জেলা, মহানগর পর্যায়ে বাছাইয়ের কাজ চলবে।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করতে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সারা দেশে মোট ৪৭০টি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ না করার বিষয়ে আদালতে রিট হলে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম ঝুলে যায়।

গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে ওই রিট নিষ্পত্তি হওয়ার পর মন্ত্রণালয় আর অপেক্ষা না করে দ্রুত গেজেটভুক্তির আবেদন যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু করতে উদ্যোগ গ্রহণ করে। আদালত বিষয়টির সুরাহা করায় আজ থেকে দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু হয়।

গত ৭ জানুয়ারি এই বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়াগত কারণে ঘোষিত তারিখ কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। ঘোষিত নতুন কর্মসূচি অনুযায়ী ৭ জানুয়ারি যেসব জেলা ও উপজেলা/মহানগরে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম হওয়ার কথা ছিল, সেটি ১১ ফেব্রুয়ারি এবং ১৪ জানুয়ারির যাচাই-বাছাই কার্যক্রম ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।

এই দিনেই বাংলার মাটিতে মহানায়কের আগমন

৭১’এ নয় মাসের বেশি সময় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকার পর ১৯৭২ সালের এই দিন দেশে ফিরে আসেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পূর্ণতা পায় ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত বিজয়ের। আহ্বান জানান, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের।

নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ পূর্নতা পায় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ। জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের। কিন্তু স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগারে রেখে এ স্বাধীনতা যেন পূর্নতা পাচ্ছিলনা। তাইতো ১০ জানুয়ারীতে মহানায়কের জন্য অপেক্ষা লাখো জনতার।

দুপুরের পর বঙ্গবন্ধু পা দেন তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়। নিরাপত্তা কর্মীদের অনুরোধ উপেক্ষা করে খোলা ট্রাকেই লাখো জনতার সাথে যাত্রা করলেন রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে। লাখো মানুষের ভালবাসার ভিড়ে দশ মিনিটের পথ পেরুতে সময় লাগলো ২ ঘন্টা।

যেখানে দাড়িয়ে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু সেই মঞ্চে দাড়িয়ে প্রথমেই স্মরণ করলেন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে যেমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দরকার ছিলো, ঠিক তেমন উদ্যমেই বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না। ১৫ই আগষ্ট স্বপরিবারে শহীদ হন মহান এই নেতা।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে সার্থক করে তুলতে হবে

ডিসেম্বর মাস আমাদের জাতির বিজয়ের মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, সামরিক বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বিশ্বের বুকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা-বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের মহানায়ক হচ্ছেন- সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা-বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু’ এই শব্দগুলো অবিচ্ছেদ্য। এগুলোকে সমার্থকও বলা যেতে পারে। একটিকে আরেকটি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

আমাদের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা প্রদান করেন। আমাদের বীর জনগণ সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণকারী সশস্ত্র পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছেন। এক কোটি মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। কোটি কোটি মানুষ নানাভাবে নির্যাতিত, নিপীড়িত, ক্ষতিগ্রস্ত, লুণ্ঠিত, অত্যাচারিত, মা-বোনের ইজ্জত-সম্ভ্রম, সব হারিয়ে লড়াই চালিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পতাকা উড়িয়ে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছেন।
পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের অবসান, গণতন্ত্র, স্বায়ত্বশাসন, জাতীয় অধিকার, শিক্ষার জন্য সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনগণের অভূতপূর্ব রায় প্রদান এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। জনগণের রায় অনুসারে বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা দিয়ে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে না দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া – ভুট্টো মিলে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। নির্বাচিত ‘জাতীয় পরিষদ’ এর অধিবেশন ৩ মার্চ আহ্বান করেও ১ মার্চ তা স্থগিত করে দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ স্বত:স্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে – স্বাধীনতার স্লোগান নিয়ে। বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে পূর্বানী হোটেলে আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির চলমান সভা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে সকল দিক নির্দেশনা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন – সেই অনুসারে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশব্যাপী চলে চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার যে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল- পরবর্তীকালে তা স্বাধীনতার জন্য প্রস্ফুটিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে রূপ লাভ করেছিল। ষাটের দশকে সামরিক শাসন বিরোধী গণতন্ত্রের আন্দোলন, শিক্ষানীতির জন্য সংগ্রাম, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর উত্থাপিত ৬ দফা সংগ্রাম এবং ঊনসত্তরে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ( যার মধ্যে ৬ দফা দাবি অন্তর্ভূক্ত ছিল এবং এক নম্বর দাবি ছিল শিক্ষার দাবি) ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান, তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা) প্রত্যাহারের ফলে বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন।

আগামীকাল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে। হত্যা করা হয় বাঙালি জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। কয়েক দশক ধরে এ দিনটি আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করে আসছি।

বাঙালিরা যাতে স্বাধীনতা অর্জন করে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে সে জন্য পাকিস্তানি ও তাদের দোসররা পরিকল্পনা করে বেছে বেছে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক চর্চার অগ্রবর্তীদের হত্যা করে। সেই থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে পালিত হয় শোকাবহ শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবসটি।

জানা যায়, দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান প্রায় শেষ। যখন বিভিন্ন জেলা থেকে পাকিস্তানিদের পরাজয়ের সুখবর আসছিল। স্বাধীন বাংলার বিশাল ধানক্ষেতের এক প্রান্তে উদয় হবে লাল সূর্য। সেই স্বাধীন বাংলার লাল সূর্য জাতির বিশিষ্ট ও শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দেখতে দেয়নি কাপুরুষের দল। পরাজয় বরণ করার আগেই, পরাজয় মেনে নিয়ে কাপুরুষের ন্যায় রাতের আঁধারে ইতিহাসের সব থেকে নোংরা হত্যাকাণ্ডে মেতে ওঠে পাকিস্তানিরা।

বিজয়ের ৪৫ বছরেও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা গণনা করতে পারেনি বাংলাদেশের কোনো সরকার। তবে বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শিক্ষাবিদ ছিলেন ৯৯১ জন, চিকিৎসক ৪৯, আইনজীবী ৪২, সাংবাদিক ১৩ ও শিল্পী-সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী ছিলেন ১৬ জন।

এ বুদ্ধিজীবীদের কোথায় কীভাবে হত্যা করা হয় তারও কোনো সঠিক তথ্য বাংলাদেশের কোনো সরকার তৈরি করতে পারেনি। সরকার এখনো জানাতে পারেনি রাষ্ট্রের এ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সমাধিস্থল কোথায়?

জাতির ক্ষণজন্মা এ সন্তানদের স্মরণে রাজধানীর রায়েরবাজার ও মিরপুরে নির্মাণ করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। সেখানে লেখা রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মদানের কথা। তদের হারানোর বেদনা দেশবাসী আজও ভুলতে পারেনি। এ শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর দেশের সর্বস্তরের জনগণ মিলিত হন শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সবাই জানান ফুলেল শুভেচ্ছা।

আজ গৌরবোজ্জ্বল ‘কলারোয়া মুক্ত’ দিবস

সাতক্ষীরা, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ জেলার ‘কলারোয়া উপজেলা মুক্ত’ দিবস আজ ৬ ডিসেম্বর। একাত্তরের আগুনঝরা এই দিনে সাতক্ষীরার কলারোয়া এলাকা পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। কলারোয়া উপজেলার আকাশে উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তিকামী মানুষের উল্লাসে মুখরিত হয় পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষত-বিক্ষত কলারোয়া। গৌরবোজ্জ্বল এদিনটি পালনের জন্য বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে কলারোয়ার ৩৪৩ জন বীর সন্তান অংশ নেন। এরমধ্যে শহিদ হন ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। কলারোয়া অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রবাসী সংগ্রাম পরিষদ। কলারোয়া এলাকা ছিল মুক্তিযুদ্ধে ৮নং সেক্টরের অধীন। কলারোয়া এলাকায় পাক-বাহিনীর আক্রমণে সর্বপ্রথমে শহীদ হন মাহমুদপুর গ্রামের আফছার সরদার। এরপর এপ্রিলে পাকবাহিনী কলারোয়ার পালপাড়ায় হামলা চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে ৯ জন কুম্ভকারকে। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ পরিচালনা করেন কলারোয়ার দুই বীর যোদ্ধা কমান্ডার মোসলেম উদ্দিন ও আব্দুল গফফার। সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তে সংঘটিত এক রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধে ৬ শতাধিক পাকসেনা নিহত হয়। কলারোয়ায় পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি বড় ধরনের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এরমধ্যে ১৮ সেপ্টেম্বরের বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। এই যুদ্ধে ২৯ জন পাকসেনা নিহত হয়। শহীদ হন ১৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া ১৭ সেপ্টেম্বর কাকডাঙ্গার যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণের মুখে পাকসেনারা কাকডাঙ্গা ঘাঁটি ছাড়তে বাধ্য হয়। এর আগে ২৭ আগস্ট সমগ্র চন্দনপুর এলাকা পাকবাহিনীর মুক্ত হয়। অক্টোবরের শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধারা কলারোয়ার পাশ্ববর্তী বাগআঁচড়ায় দুঃসাহসিক হামলা চালিয়ে ৭ জন পাক রেঞ্জারকে হত্যা করেন। খোরদো এলাকাও বীরযোদ্ধারা মুক্ত করে ফেলেন। কলারোয়ার বীরযোদ্ধাদের ধারাবাহিক সফল অপারেশনের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাক বাহিনী। তারা যখন বুঝতে পারলো যে তাদের পরাজয় নিশ্চিত, তখন তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর চেষ্টা করে। এরই অংশ হিসেবে ৫ ডিসেম্বর রাত ১২ টা ১ মিনিটে কলারোয়ার বেত্রবতী নদীর লোহার ব্রিজ মাইন বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়ে পাকসেনারা পালিয়ে যায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা নৌকাযোগে নদী পার হয়ে এসে কলারোয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে আনেন। সময় তখন ভোর ৫ টা ১৫ মিনিট। এভাবে একেকটি সকল অপারেশনের মধ্য দিয়ে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর কবল থেকে কলারোয়ার মাটিকে মুক্ত করেছিলেন আজকের এই দিনে। কলারোয়া থানায় পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে সবুজের বুকে রক্তসূর্য খচিত স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ান মুক্তিকামী বীরযোদ্ধা ও জনতা। শুধু মুক্তিযোদ্ধারা নন কলারোয়ার অনেক মুক্তিযদ্ধের সংগঠকদের কথা মানুষের স্মৃতিপটে আজ অমলিন। তারা হলেন : প্রয়াত মমতাজ আহমেদ, এমপিএ তার ভাই শহীদ এসএম এন্তাজ আলি, স্বর্গীয় শ্যামাপদ শেঠ, ভাষাসৈনিক প্রয়াত শেখ আমানুল্লাহ, বিএম নজরুল ইসলামসহ অনেকেই। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও সংগঠকদের সুচিন্তিত দিক নির্দেশনায় অবশেষে কলারোয়ার পবিত্র ভূমি পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর।
সূত্রঃবাসস।